ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে নারীসমাজের সাহসী ভূমিকা
লেখক: হেনা দাস
গত শতকের ত্রিশের দশকে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তীব্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশের ধারায় গোটা উপমহাদেশে বিশেষভাবে অবিভক্ত বাংলায় শ্রমিক কৃষক ও অন্যান্য মেহনতি শ্রেণীর সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। এ সময় কমিউনিস্টদের উদ্যোগেই সারা বাংলার জেলায় জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষকদের নিজস্ব গণসংগঠন। যদিও বহু আগে থেকেই জমিদারদের মাত্রাহীন জুলুম, অত্যাচার ও সঠিকভাবে সামন্ততান্ত্রিক নিষ্ঠুর নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ও লড়াই সংগ্রামের অনেক ঘটনা ঘটে এসেছে, তবুও ত্রিশের দশকের শেষভাগেই কৃষক সমিতির নেতৃত্বে জমিদারিপ্রথাসহ সকল সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে কৃষকদের ব্যাপক সংগঠিত আন্দোলন শুরু হয়।
চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের তাণ্ডব, বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, ইংরেজ শাসনের চরম ব্যর্থতা ও দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন আরও নতুন মাত্রা ও ব্যাপ্তি লাভ করে, তেমনি এই সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায় শ্রমিক কৃষকসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের আন্দোলন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে এমনি এক পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলায় কৃষকদের ঐতিহাসিক সাড়া-জাগানো তেভাগা আন্দোলন শুরু হয়। জমিদারিপ্রথার অধীনে যে বর্গাচাষ বা আধিপ্রথা চালু হয়, তাতে ফসল উৎপাদনের জন্য লাঙ্গল, বীজ, বলদসহ উৎপাদনের সমস্ত খরচ বহন করতে হত চাষিকেই। তারাই পরিশ্রম করে ফসল ফলাত কিন্তু ফসলের অর্ধেক দিয়ে দিতে হত জমিদার, জোতদারকে। তারা পেত বাকি অর্ধেক। এই অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৪৬-এর সেপ্টেম্বরে কৃষক সভার বঙ্গীয় প্রাদেশিক কাউন্সিলের সভায়। দাবি হল: (১) ফসলের একভাগ পাবে জমির মালিক, দুইভাগ দিতে হবে ভাগচাষি অর্থাৎ বর্গাদারকে, (২) জমিতে ভাগচাষিদের দখলিস্বত্ব দিতে হবে, (৩) মনকড়া ধানে পাঁচ সেরের বেশি সুদ নেই, (৪) ভাগচাষিদের গোলায় ধান তুলতে হবে। তেভাগার দাবিতে এই আন্দোলন ৪৬-এর ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ৪৭সাল জুড়ে চলতে থাকে। দেখতে দেখতে সারা বাংলায় এই তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং মোট ১৯টি জেলায় তা সবচাইতে জঙ্গিরূপ ধারণ করে। এই ১৯টি জেলার মধ্যে ১০টি হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশের সাবেক জেলা। আন্দোলনের শ্লোগান ছিল-"ইনক্লাব জিন্দাবাদ, নিজ খোলানে ধান তোল, আধির বদলে তেভাগা চাই।"
তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এ আন্দোলনে ব্যাপক নারীসমাজের বীরত্বপূর্ণ জঙ্গি অংশগ্রহণ। শুধু তেভাগা আন্দোলনেই নয় তার পাশাপাশি সমসাময়িক আরও দুটো ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনে মৈমনসিংহ অঞ্চলে ধানকড়ারি খাজনাপ্রথা বাতিলের দাবিতে টংক আন্দোলনে এবং সিলেটে মধ্যযুগীয় বর্বর দাসপ্রথার অনুরূপ নান্কার প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনেও নারীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। টংক ও নান্কার আন্দোলন অঞ্চলভিত্তিক আন্দোলন হলেও সারা বাংলার মূল আন্দোলন তেভাগা থেকে এ দুটো আন্দোলনকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। কাজেই তেভাগা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা আলোচনা করতে গিয়ে টংক ও নান্কার আন্দোলনে নারীসমাজ যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা অপরিহার্যভাবেই আলোচনায় আসবে। প্রথমে এসব আন্দোলনে নারীর ভূমিকার স্বরূপটি বোঝার জন্য কিছু ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে যেসব জেলায় জোতদাররা ভাগ-চাষিদের সাথে প্রায় দাসের মতো ব্যবহার করত এবং শোষণ ও অত্যাচার ছিল সীমাহীন, সেইসব জেলাতেই তেভাগা আন্দোলন সবচাইতে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এর মধ্যে দিনাজপুর জেলার বিশেষভাবে তৎকালীন ঠাকুরগাঁ মহকুমায় এই আন্দোলন সর্বাধিক ব্যাপকতা লাভ করে। এটাই ছিল তেভাগা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। দিনাজপুর জেলার আন্দোলনে কৃষক রমণীদের অভূতপূর্ব বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা লক্ষ করা যায়।
এই জেলার অন্তর্গত ঠাকুরগাঁ মহকুমার আটোয়ারি থানায় ফুলঝরি নামে এক জোতদারের জমিতে প্রথমে তেভাগার ধান কাটা শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবক কৃষকরা লালঝাণ্ডা নিয়ে দল বেঁধে ধান কাটে আর গ্রামের বাকি নারী-পুরুষ থাকে পাহারায়। পরদিনই সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী গ্রামে এসে ৩২ জন কৃষক কর্মীকে গ্রেপ্তার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments